সময়।

এই একটি মাত্র শব্দ সমগ্র মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বিষয়। সময়ের পরিক্রমার মধ্যে আমাদের জীবন তথা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শৃংখলা নিহিত। আমরা কেউই সময়ের আবর্তন কে অস্বীকার করতে পারি না। সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, যুগ, শতাব্দী এভাবে সময় ক্রমে ক্রমে অতিবাহিত হয় তার আপন ধারায়। সময়ের এই বয়ে চলার নিয়মকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কিন্তু, সত্যিই কি তাই?  উত্তরঃ না।

সাল ১৮৪৬। বিখ্যাত বিজ্ঞানী Sir Isaac Newton এর প্রদান করা সূত্র গুলোর মাধ্যমে বেশির ভাগ গ্রহের কক্ষপথ ও অবস্থানের সঠিক মাপকাঠি দিতে পারলেও বুধ এবং ইউরেনাসের কক্ষপথ-অবস্থান নির্নয়ের ক্ষেত্রে বারংবার বিভ্রান্তিতে পরতে হয় ফরাসি জ্যোতিবিজ্ঞানী Urbain Jean Joseph Le Verrier কে। কারন তৎকালীন সময় নিউটনের দেয়া সূত্র গুলোই ছিল তাদের মূল নির্নায়ক। কিন্তুু নিউটনের সূত্র গুলোর কিছু বাধ্যবাধকতা ছিলো। তাঁর সূত্রে বেগ (Velocity) যখন আলোর বেগের কাছাকাছি চলে যায় তখন তা ভর, সময়, দৈর্ঘ্যের তারতম্য নির্নয় করতে পারে না।

photo from Unsplash


উনিশ শতকে এই সমস্যার সমাধান নিয়ে এলো বিজ্ঞানী তথা তাত্ত্বিক পদার্থবিদ Sir Albert Einstein তাঁর Theory of Relativity এর মাধ্যমে। 
স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বকে দুভাগে ভাগ করা হয়।

১. Special Theory of Relativity বা বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব।

এটি ১৯০৫ সালে প্রবর্তন করা হয়। এর মূল বিষয়-বস্তুু এতটাই সহজ যে  একটি বাচ্চাও তা বুঝতে সক্ষম। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের গাণিতিক-রূপ বোঝার জন্য নবম-দশম শ্রেণীর গণিত জানা থাকলেই যথেষ্ট। 

২. General Theory of Relativity বা সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব।

এটি ১৯১৬ সালে প্রবর্তন করা হয়। এ পর্যন্ত পৃথিবীর হাতে গোনা অল্প সংখ্যক বিজ্ঞানীরা এটা বুঝতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের গাণিতিক-রূপ বোঝার জন্য উচ্চতর শ্রেণীর গণিত জানতে হয়।


সময়ের প্রসারণ বিষয়টি Special Theory of Relativity এর অংশ বিশেষ। Sir Isaac Newton এর মতে সময় পরম (Absolute)। তবে Sir Albert Einstein এর মতে কোন কিছুই পরম নয়, বরং সবকিছুই আপেক্ষিক। এমনকি সময় ও। সময়কে ধীর বা সংকোচন করা যায় বেগ (Velocity) এর মাধ্যমে। 

তবে বেগ কেন?

photo from unsplash

সেটা বের করার জন্য আমাদের খানিকটা কল্পনা শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে । 
মনে করা যাক, আপনি একটি মহা-সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। এখন আপনার কাছে একটি অদ্ভুত ধরনের ঘড়ি আছে যাতে দুমুখো দুটো আয়না আছে। ধরা যাক তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব D। আলোকরশ্মি আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে পুনরায় ফিরে আসতে সময় লাগে ধরা যাক  T সময়। অর্থাৎ বলা যায়, আপনি স্থির অবস্থানে দাঁড়িয়ে আপনার সাপেক্ষে ঘড়িটির আলোকরশ্মি T সময় 2D দূরত্ব অতিক্রম করেছে।
 এখন আপনার এক বন্ধু ওই সময় মহাসড়কের একটি স্থির বাসে বসে ছিল। তার কাছেও ঠিক একই রকম ঘড়ি । সুতরাং স্থির বাসে থাকাকালীন তার ঘড়িতেও আলোকরশ্মি T সময় 2D দূরত্ব অতিক্রম করবে।


 কিন্তু বাসটি যদি গতিশীল থাকতো !  তাহলেও কি ঠিক একই ঘটনা ঘটতো ? 

উত্তরঃ না।


 কারণ বাসটি যদি গতিশীল থাকতো তখন আপনার সাপেক্ষে বাসটি তার পূর্বের অবস্থানে থেকে ক্রমশ সরে যেত এবং বাসে থাকা আপনার বন্ধুর ঘড়িটির আলোক রশ্মি প্রতিফলিত হওয়ার জন্য আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হতো ।

তবে মজার ব্যাপার হলো, আপনার বন্ধুটির সাপেক্ষে তার ঘড়িটির অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না ! কারণ আপনার বন্ধু এবং ঘড়িটি পরস্পরের সাপেক্ষে স্থির।


সুতরাং, প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে যদি কোন বস্তুর বেগ বৃদ্ধি করা যায় তবে সময়কে ধীর করা সম্ভব।
কিন্তু এই বেগ বৃদ্ধি মানে কোন সামান্য বেগ নয়। প্রচন্ড রকমের বেগ বৃদ্ধি হলেই কেবল এর প্রভাব বোঝা যাবে। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব মতে যা প্রায় আলোর বেগে (c = 299,792,458 meter per second)  এর কাছাকাছি। তবে আপেক্ষিক তত্ত্ব মতে আলোর বেগের সমান বা দ্রুততর হওয়া সম্ভব নয়। কারন, যার ভর (Mass) আছে তাকে আলোর বেগ দেয়া অসম্ভব। যেমনঃ আমরা জানি আলোর কণা কে ফোটন (Photon) বলে। যা ভরহীন (Zero Mass)। এই ভরহীনতার জন্যই ফোটন বা আলোক কণার বেগ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সর্বোচ্চ ! এবং ফোটন কণার এই ভীষণ গতির জন্য এর উপর সময়ের কোন প্রভাব পরে না। অর্থাৎ এক বিলিয়ন (১০০০,০০০,০০০) বছর আগে উৎপন্ন হওয়া ফোটনের বয়স আমাদের সাপেক্ষে এক বিলিয়ন হলেও এর নিজের সাপেক্ষে শূন্য ! 
এখন আমরা একটি উদাহরণের দিকে যাব। ধরি, পৃথিবীতে থাকা পিতা-পুত্রের বয়স যথাক্রমে ৪২ ও ২০ বছর। পিতা একটি মহাকাশযানে করে ০.৯৮ c বেগে ৪+৪ বা ৮ বছর মহাকাশে যাত্রা করে (সামনে গিয়েছে ৪ বছর এবং সেখান থেকে ফিরে এসেছে ৪ বছর) পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। এখন দেখার পালা পৃথিবীতে এসে পিতা ও পুত্রের বয়স কত দাঁড়ায় !!! 

দেয়া আছে ,

t0 = 8 Years {মহাকাশ যানে থাকা পিতার অতিক্রান্ত সময়}

c = 3.0 x 108ms-1  {আলোর বেগ}

V = 2.94 x 108ms-1 {মহাকাশযানে বেগ }

T = ? { পৃথিবীতে অতিক্রান্ত সময় }

T= t0/(1-v2/v2)root

T = 8/{1-(2.94 x 108)2/(3.0 x 108)2}

T= 40.20

মহাকাশযানে থাকা পিতার বয়স = 42+8 = 50 বছর

পৃথীবিতে থাকা পূত্রের বয়স = 20 + 40.20 = 60.20 বছর

অতএব, দেখা যাচ্ছে পিতার বয়স ৫০ বছর এবং পুত্রের বয়স ৬০ বছরের থেকেও একটু বেশি !!! 
অনেকেই এগুলোকে কু-যুক্তি বলে গালমন্দ করতে পারে। তবে ব্যবহারিক ভাবেও Time Dilation প্রমাণিত। 
বিজ্ঞানের কোন তত্ত্ব আবিষ্কারের পর সেই তত্ত্বকে কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের সত্যতা প্রমান করতে হয়। সেই লক্ষ্যে ১৯৭৭ সালে একদল বিজ্ঞানী অ্যাটমিক ক্লক নামে অত্যন্ত সূক্ষ্ম এক ধরনের ঘড়ি নিয়ে বিমানে করে বিশ্ব পরিভ্রমণেবের হয়েছিলেন। পৃথিবীর আকাশে বেশ খানিকটা আবর্তন করে তারা নিচে নেমে দেখলেন সত্যি সত্যি তাদের সেই অ্যাটমিক ক্লকের অতিক্রান্ত সময় পৃথিবীতে থাকা অতিক্রান্ত সময়ের থেকে কম ! যদিও তারতম্যটা খুবই কম যা আমাদের সাধারণ ঘড়িতে ধরা পরবে না। তবুও কৌতুহলী পাঠকগণ বিমানযাত্রার সময় Cesium Clock দিয়ে চেষ্টা করতে পারেন। কারন ১ সেকেন্ড আপনার আমার কাছে খুবই নগন্য সময় হতে পারে, তবে Cesimu-133 পরমানুর জন্য ১ সেকেন্ড হলো  ৯১৯, ২৬, ৩১, ৭৭০ ( নয়শত উনিশ কোটি ছাব্বিশ লক্ষ একত্রিশ হাজার সাতশত সত্তর ) বার স্পন্দনের সময়ের সমান !!!

Joy Halder ( B.Sc in Computer Science and Engineering )
Nanjing University of Posts & Telecommunications
Jiangsu, China.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *