মানব সভ্যতার বিকাশের সর্বোচ্চ লক্ষ্য জ্ঞানার্জন।সমগ্র পৃথিবীতে প্রাপ্ত সকল তথ্য-জ্ঞান একটি মাত্র ছাদের নিচে সংগ্রহ করার দুঃসাহসীক লক্ষ্য স্থির করেছিলেন আজ থেকে প্রায় ২৩০০ বছর আগের আলেকজান্দ্রিয়ার শাসকরা। এই লক্ষ্যে আলেক্সান্দ্রিয়া লাইব্রেরী নামক একটি লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠিত হয়; যাতে অভূতপূর্ব সংখ্যক বই রেখেছিল যা তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তিদের মনকে এই লাইব্রেরী প্রতি আকর্ষণ করেছিল। তবে ৫০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এই লাইব্রেরী বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু এই মহান জ্ঞানভান্ডারে বিনাশ কেন ও কিভাবে হয়? 
অনেকের বিশ্বাস যে এটি একটি অগ্নিকাণ্ডের কারণে ঘটে তবে এই লাইব্রেরী ধংষের প্রকৃত কারণটা অনেকটাই জটিল !

ঐতিহাসিক আলেকজেন্দ্রিয়া লাইব্রেরী


এই মহান লাইব্রেরি তৈরি প্রথম চিন্তা আসে আলেকজান্ডার দি গ্রেটের দূর-দৃষ্টিময় চিন্তা থেকে। তিনি নিজেকে একজন সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বহুদিন পর গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টোটলের একজন প্রাক্তন ছাত্র বিশ্বের জ্ঞান চর্চার একটি প্রধান রাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আলেকজান্ডার দি গ্রেট এর মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তবেই তিনি মহান লাইব্রেরীটির প্রতিষ্ঠার কাজ শুরুর পূর্বেই মারা যান। তাঁর এই মহান চিন্তাটা টলেমি দা ফার্স্ট বাস্তবে রূপান্তর করেন এবং এটিকে একটি লাইব্রেরী এবং জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। 


আলেকজান্দ্রিয়া শহরের প্রধান ব্যস্ততম অঞ্চলে বৃহত্তর হেলেনিস্টিক কলাম, মিশরীয় শিল্পকলা এবং বিশ্বের নানান ভাস্কর্যের মাধ্যমে এর ভবন নির্মিত হয়। এই লাইব্রেরিতে ছিল লেকচার হল, শ্রেণিকক্ষ এবং অগণিত বুক-সেল্ফ। 


যখন এর নির্মাণকাজ শেষ হয় টলেমি দা ফাস্ট প্রথমে একে গ্রিক ও মিশরীয় বই দ্বারা পূর্ণ করা শুরু করেন। তিনি তার রাজ্যের মহান পণ্ডিতের আমন্ত্রণ করতেন এবং সেখানে থেকে তাদের জ্ঞান চর্চার জন্য রাখতেন।
ধীরে ধীরে লাইব্রেরীটি  তাদের নিজস্ব পান্ডুলিপিতে ভরে উঠতে থাকে।

ঐতিহাসিক আলেকজেন্দ্রিয়া লাইব্রেরী
ঐতিহাসিক আলেকজেন্দ্রিয়া লাইব্রেরী

তৎকালীন আলেকজান্দ্রিয়ার শাসকগণ চাইতেন এখানে পৃথিবীর সমস্ত বইয়ের অন্তত একটি অনুলিপি রাখতে। সৌভাগ্যবশত আলেকজান্দ্রিয়াতে মধ্যপ্রাচ্যের একটি সমুদ্র বন্দর ছিল।  টলেমি দা থার্ড তখন একটি নীতি জারী করেন যাতে; প্রতিটি জাহাজ বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে তাদের সমুদ্র বন্দরে আসার সময় তাদের অঞ্চল থেকে কিছু বই নিয়ে আসবে। যাতে তারা সেই বইগুলোর একটি অনুলিপি তৈরি করতে পারে এবং তাদের লাইব্রেরীটিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। অনুলিপি তৈরি করার পর মূল বইটি তাদের ফেরত দিয়ে দেয়া হতো এবং এর পরিবর্তে তারা কিছু ভর্তুকি পেত। এজন্য অনেকেই এই নতুন বই খোঁজা এবং এটিকে আলেকজান্দ্রিয়ায় নিয়ে আসাকে তাদের নিজেদের পেশা বানিয়ে ফেলেছিলেন। তাদের ” বুক হান্টার ” ডাকা হত। 


এভাবে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি লাখ লাখ বইয়ের সংগ্রহশালায় পরিণত হয়। তবে ধীরে ধীরে বইয়ের বিশাল সমারোহ নির্দিষ্ট বিষয়ের বই খুঁজে বের করার প্রতি বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো। তখন একজন পন্ডিত কলিমাচাস একটি সমাধান বের করেছিলেন। তিনি একশ বিশ টি ক্যাটালগ বানালেন লাইব্রেরীর বইগুলো সম্পর্কে। এগুলো ব্যবহার করে একজন পাঠক অতি সহজে নির্দিষ্ট বিষয়ের বইগুলোর সঠিক অবস্থান পেয়ে যেতেন।

Alexander the Great (photo from Unsplash)

 
  অবিস্বরনীয় কিছু আবিষ্কার: 

 
১. ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রার ১৬০০ বছর পূর্বে ইরাটোস্থিনিস পৃথিবীর গোলাকৃতি আকার আবিষ্কার করেন এবং পাশাপাশি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয় করে ফেলেছিলেন। যা প্রকৃত ব্যাসার্ধের খুবই কাছাকাছি ছিল। 


২. লাইব্রেরির একজন পন্ডিত হেরণ বাষ্প ইঞ্জিন তৈরি করেছিলেন প্রায় এক হাজার বছর আগে যখন তা পূর্ন উদ্ভাবন করা হয় শিল্প বিপ্লবের পূর্বে। 

৩. হিপার্কাস নক্ষত্রের সঠিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ও তাদের নিখুঁত ক্যাটালগ তৈরি করেছিলেন। 


৪. ইউক্লিড তার বিখ্যাত জ্যামিতির বই  এবং চিকিৎসা শাস্ত্র লিখে গিয়েছিলেন। এ রকম আরও অজস্র গবেষণার উদাহরণ দেয়া যাবে। 


আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার ৩০০ বছর পর অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ২৮৩ তে এটি  সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ৪৮ খ্রিস্টপূর্বে জুলিয়াস সিজার আলেকজান্দ্রিয়া কে অবরুদ্ধ করে ফেলেন এবং সমুদ্র বন্দরের জাহাজগুলো আগুনে পুড়িয়ে ফেললেন। অনেক বছর যাবত মানুষগণ বিশ্বাস করতেন যে শহরে আগুন ছড়িয়ে পড়ার জন্য লাইব্রেরিটি পুড়ে যায়। এটা সম্ভব ছিলো যে আগুনের পরে লাইব্রেরীর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে পাওয়া যায় যে অগ্নিকান্ডের পরেও পন্ডিতগন লাইব্রেরিতে তাদের জ্ঞান চর্চা চালিয়ে যান।

(Photo From Science_Photo.com) Death of Hypatia in Alexandria. The Greek mathematician and astronomer Hypatia of Alexandria (c.370-415 AD) was the first notable female scientist. She taught Neoplatonic and Aristotelian philosophy and wrote several works on mathematics and astronomy. Her ideas were frowned upon by the new religions, and during a riot, she was brutally murdered by a Christian mob. Artwork from the 19th-century book Vies des Savants Illustres.


সময়েরর পরিবর্তনের সাথে সাথে শহরের শাসক পরিবর্তন হতে থাকে। গ্রীক থেকে রোমান, রোমান থেকে খ্রিস্টান, খ্রিস্টানদের থেকে মুসলিমদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়। প্রতিটি নতুন শাসকগন এই মহান লাইব্রেরিটিকে তাদের গর্ব মনে করার পরিবর্তে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। 
৪১৫ সালে শহরটির একজন খ্রিস্টান শাসক হাইপেশিয়া নামের একজন নারী গণিতবিদ ও দার্শনিকে অত্যন্ত বর্বরতার সাথে হত্যা করেছিলেন। সেই সময়কার এই মহান নারী গণিতবিদ ও দার্শনিকের সম্মানার্থে বর্তমানে চাঁদের একটি অংশের নামকরন করা হয় তাঁর নামানুসারে। 


কথিত আছে হাইপেশিয়াকে হত্যার পর সে মহান লাইব্রেরীর বই গুলো কে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়েছিল। তবে কারা করেছিলো তা আজও রহস্যের মায়াজালে ঘেরা। শোনা যায় যে তারা সেই অমূল্য বই গুলে পুঁড়িয়ে তাদের গোসলখানার পানি গরম করতেন এবং সবগুলো বই পোঁড়াতে তাদের প্রায় ছয় মাসেরও বেশি সময় লেগেছিল। 

বর্তমানে ঐতিহাসিক আলেকজেন্দ্রিয়া লাইব্রেরী


পৃথিবীর এই মহান জ্ঞানভান্ডার নষ্ট করার পরে জ্ঞানচর্চা বেশ লম্বা সময়ের জন্য থমকে যায়। ২,৪ বছরেরে জন্য নয়; প্রায় ১০০০ বছরের জন্য। কোপানির্কাস, গ্যালেলিও, নিউটনরা এসে সেই অন্ধকার দূর করার চেষ্টা শুরু না করা পর্যন্ত পৃথিবী ১০০০ বছরের জন্য অন্ধকারে ঢাকা পরেছিলো এই মহান আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি ধংষের কারনে ।

Joy Halder ( B.Sc in Computer Science and Engineering )
Nanjing University of Posts & Telecommunications
Jiangsu, China.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *