দুপুর বেলা যখন সূর্যটা আমাদের মাথার উপরে থাকে তখন মনে হয় যেন মাথার উপরে জলছে একটি গনগনে অগ্নিপিণ্ড। কখনো কি ভেবে দেখেছি এই অগ্নিপিণ্ড টি কেন নিভে যায় না? 

সূর্য জ্বলতে হলে যে পরিমাণ আলো, তাপ এবং শক্তির প্রয়োজন সূর্য তা কোত্থেকে থেকে পায়? 

সেই ক্লাসিক্যাল পদার্থ বিজ্ঞানের উপর যদি এখনো নির্ভর করা হতো তাহলে আমরা এখনো জানতে পারতাম না যে সূর্য কিভাবে জ্বালানি পেয়ে থাকে অথবা সূর্য কিভাবে জ্বলে!

আর এই রহস্য ভেদ করেছে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। কেনো সূর্য একটি দিয়াশলাইয়ের কাঠির মতো জ্বললেও তা পুড়ে শেষ হয়ে যায় না? 

আজকের আর্টিকেলে এই রহস্য ব্যাখ্যা করব কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মাধ্যমে।

photo from spaceplace site by nasa

আমাদের পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব থেকে শুরু করে সমগ্র জীবজগৎ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে সূর্য। সূর্য না থাকলে আমাদের পৃথিবী হতো একটি অন্ধকার, ঠান্ডা, বরফ, পাথরের পিণ্ড। আমাদের পৃথিবীর সকল উপাদান এর পেছনের কারণটি হচ্ছে সূর্য আর এই তথ্যটি আমাদের পূর্বসূরিরা অনেক আগেই জেনে ফেলেছিল। আর তাই আদিমকাল থেকে সূর্যকে জায়গা দিয়েছে মানুষ দেবতার আসনে। এবং পূর্বে শতাব্দী মানুষের ধারণা ছিল না সূর্য দেবতা কিভাবে পৃথিবীকে  লালন পালন করে আসছে।

আমরা জানি যে সূর্য একটি বিশাল বড় নক্ষত্র আর প্রত্যেকটি নক্ষত্রের শক্তি তৈরি হয় তার কেন্দ্রের ভেতরে, আর সূর্যের ও শক্তি তৈরি হয় তার পেটের মধ্যে। এবং সূর্যের কেন্দ্রে আছে নিউক্লিয়ার ফিউশন চুল্লি। নিউক্লিয়ার ফিউশন কে বাংলায় বলা হয় কেন্দ্রিন  সংযোজন। কোন পদার্থের দুটি পরমাণু যখন এক হয়ে নতুন একটি ভারী পরমাণু সৃষ্টি করে তখন তাকে বলা হয়  ফিউশন। এই ফিউশন থেকে বেরিয়ে আসে গামা আর নিউটন রশ্মির বিপুল শক্তি। তবে দুইটি পরমাণু পাশাপাশি থাকলেই কিন্তু ফিউশন ঘটে যায় ন,  এর জন্য দরকার হয় সূর্যের কেন্দ্রে এক বিশেষ পরিস্থিতির।

সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রা প্রায় দেড় কোটি (১.৫ মিলিয়ন) সেলসিয়াস বা কেলভিন। অথবা প্রায় তিন কোটি (২.৭ মিলিয়ন)  ফারেনহাইট। মিলিয়ন মিলিয়ন সংখ্যাগুলো কিন্তু অনুমান করা যাচ্ছে না। দেড় কোটি তিন কোটি এগুলো সংখ্যায় বললে কিন্তু কিছু বোঝা যাচ্ছে না।  কল্পনা করুন আপনি ফুটন্ত গরম লাভায় হাত রাখলেন। ফুটন্ত গরম লাভার গড় তাপমাত্রা ৭০০-১২০০° সেলসিয়াস। এবার এই তাপমাত্রাকে ১২ হাজার দিয়ে গুন করলে যে সংখ্যা পাওয়া যাবে সেই পরিমান তাপমাত্রা রয়েছে সূর্যের কেন্দ্রে। আবার আমাদের পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের চাপের চেয়ে সূর্যের কেন্দ্রের চাপ প্রায় ২৫ হাজার কোটি গুন বেশী।  শুনতে খুব বেশী মনে হলেও অবাক করা বিষয় হচ্ছে সূর্যের কেন্দ্রে ফিউশন ঘটানোর জন্য কিন্তু এই তাপ এবং চাপ যথেষ্ট নয়।

তাহলে সুর্যের ভিতর ফিউশন ঘটছে কিভাবে? 

সূর্য প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ হাইড্রোজেন দিয়ে তৈরি, যেটা হচ্ছে তার শক্তির উৎস। আর আমরা জানি প্রত্যেক হাইড্রোজেন পরমানুতে রয়েছে  একটি করে প্রোটন থাকে।  আর এই প্রোটনের চার্জ ধনাত্মক।  এবং আমরা এটাও জানি যে একই রকমের চার্জ একে অপরকে বিকর্ষণ করে। তাই ধনাত্মক চার্জ পূর্ণ প্রোটনেরা শক্তিশালী চুম্বকের মত যত কাছাকাছি আসে ততোই বিকর্ষণ করে। এটাকে বলা হয় কুলম্ব বিকর্ষণ শক্তি। এই বিকর্ষণ শক্তি এতটাই জোরালো যে এদের পক্ষে নিজে নিজে জুড়ে যাওয়া অসম্ভব। যদি না প্রচন্ড রকমের বেশি তাপমাত্রায় তাদের রাখা হয়। এর জন্য 1000 কোটি কেলভিনের বেশি তাপমাত্রা প্রয়োজন। কিন্তু সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রা তো মাত্র দেড় কোটি। 

তাহলে এরা জুড়ছে কিভাবে?

এখন এটা করার জন্য আমাদের প্রয়োজন হবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার। এই কোয়ান্টাম জগতে প্রোটনের শুধু কনায় নয়,  তারা তরঙ্গ বা ঢেউয়ের  মত আচরণ করে। আমাদের জন্য অদ্ভুত শোনালেও এটাই কোয়ান্টাম জগতের ক্ষুদ্র কনার জন্য বাস্তবতা। অর্থাৎ এখানে প্রতিটা পরমাণু একই সাথে কনা এবং তরঙ্গেরও একেকটা প্যাকেট। তাই এই হাইড্রোজেন পরমানুরা কাছাকাছি এলে যা ঘটে তা হলো এদের ভেতরের প্রোটিনের যে তরঙ্গের ঢেউ ওই ঢেউ একটা এসে পরে অন্যটার উপরে।  কিন্তু তরঙ্গ মিললেই তো আর প্রোটিনেরা জুড়ে যাচ্ছে না।  ওই যে বলেছিলাম একই রকমের ধনাত্মক চার্জ এর কারনে প্রোটনেরা একে অপরকে প্রবল বেগে বিকর্ষণ করে থাকে।  তবে এখানে একটা বিশেষ ঘটনা ঘটে এই অজস্র প্রোটনের তরঙ্গের ভিড়ে দুই একটা প্রোটন কখনো কখনো অন্য একটা প্রোটিনের সাথে সেই কুলম্ব বিকর্ষণী শক্তিকে হারিয়ে দিয়ে মাঝখান দিয়ে একটা সুড়ঙ্গ বানিয়ে ফেলে।  তারপর সেই সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে চলে গিয়া অন্য একটা প্রোটনের সাথে জুড়ে যায়।  যার বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে কোয়ান্টাম টানেলিং। এবং প্রোটনের এই সুড়ঙ্গ বানিয়ে ঢোকার জন্য আর ১০০০ কোটি কেলভিন লাগে না।  এর জন্য ১.৫ কোটি কেলভিন ই যথেষ্ট।  আর দুই খানা প্রোটন যেই জুড়ে যায় তখনই তৈরি হয় শক্তি।  সুর্যের ব্যাটারি যায় চার্জ হয়ে। কিন্তু আবার একটা প্রোটনের সুড়ঙ্গ করে আবার আরেকটা প্রোটিনের সাথে মিলে যাওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু খুবই কম।  মনে করা হয় গড়ে একটা প্রোটনকে কয়েকশো কোটি বছর অপেক্ষা করতে হয় সুড়ঙ্গিত হতে। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে এতো সময় নিয়ে যদি এরকম একটা ঘটনা ঘটে তাহলে সূর্যের এত শক্তির অবিরত যোগান আসছে কীভাবে?

আসলে সুর্য একটা মাঝারি মাপের নক্ষত্র  হলেও সে কিন্তু একেবারেই ছোট না।  সুর্যের বিশাল পেটের ভেতর ১৩ লক্ষ পৃথিবী অনায়াসে জায়গা করে নিতে পারবে।  তার পেটের ভেতর প্রোটন আছে আজস্র।  যাদের মধ্য থেকে অল্প কয়েকজন সফল হলেও প্রতি সেকেন্ডে বহু প্রোটন সংযোজিত হয়ে যায় আর তা দিয়েই আসতে থাকে শক্তির অনবরত যোগান। আবার ওই দিকে এতো কম একটা দুইটা করে প্রোটন জোড়ে বলে প্রোটিনের ভান্ডারও ফুরায় না হাজার কোটি বছর ধরে।  এখন এই সূর্যের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন পরমানুর চারটি প্রোটন মিলে তৈরি করে একটি  হিলিয়াম পরমানু, দুটি পজিট্রন, দুটি নিউট্রিনো ও দুটি গামা রশ্মি।  ফোটন হলো আলোর কনিকা।  আর গামা ফোটন হলো আমরা যে আলো দেখি চারপাশে তার থেকে অনেক শক্তিশালী।  তারপর কেন্দ্র থেকে গামা শক্তি বেরিয়ে আসতে শুরু করে এবং সূর্যের কেন্দ্র থেকে নানা স্তর পেরিয়ে বাইরের পিঠে পৌঁছাতে এর সময় লাগে লক্ষ বছর। তো এতটা সময় ধরে পথ পাড়ি দিতে গিয়ে তার শক্তি কমে যায়। আর সেই ক্ষয় হয়ে যাওয়া শক্তির বেশিত ভাগই বেরিয়ে আসে আলোর আকারে। আর সেই আলোর সূর্য থেকে পৃথিবীতে পৌছাতে লাগে মাত্র ৮ মিনিট। তার মানে হলো এখন আপনি সূর্যের আলোয় গিয়ে দাড়ালে যে আলোটা আপনার শরীরে এসে পড়বে সেটা হয়তো সুর্যের কেন্দ্রে হাজার হাজার বছর আগে সৃষ্টি হয়েছে। এই তো গেলো কোয়ান্টাম টানেলিং এর মাধ্যমে সুর্যের তাপ, আলো,শক্তি বাড়ানোর গল্প।  কিন্তু সূর্য কেনো আজও নিভে যায় নি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারন হচ্ছে ওই যে দুটো করে প্রোটন জোড়ে হিলিয়াম তৈরি হচ্ছে সেই হিলিয়াম এর একটা পরমাণু তে আছে দুটো প্রোটন আর দুটো নিউট্রন।  তো হিলিয়াম বানানোর সময় একটা প্রোটন ভেঙে তৈরি হয় একটা নিউট্রন একটা পজিট্রন আর একটা ইলেকট্রন নিউট্রিনো। এবং এই ভাঙার প্রক্রিয়া টা ঘটে ভীষণ ধীর গতিতে। এখানে যে বলটা কাজ করে তার নাম হচ্ছে দূর্বল বল। এবং এই বলের কারনেই হিলিয়াম তৈরির সময় প্রোটন ভাঙার কাজটা ঘটে খুব ধীরে।  আর এতো ধীরে ধীরে হয় বলে সূর্যের জ্বলে পুড়ে ফুরিয়ে যাওয়ার ঘটনাটাও পিছিয়ে যায়।  সূর্য প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি কিলোগ্রাম ভরকে শক্তিতে রুপান্তর করছে। 

সুর্যের শক্তির রহস্যের সমাধান নিয়ে এই যে গল্পটা আপনাদের বললাম এখন তো অনেকেই বলবেন এগুলো জানা গেলো কিভাবে! 

সূর্যের পেটের ভিতর এই নিউক্লিয়ার ফিউশনটা যে আসলেই ঘটছে তার প্রমান কি!  

প্রামান আছে! 

বলেছিলাম ফিউশন এর মাধ্যমে হিলিয়াম তৈরির সময় একটা প্রোটন ভেঙে একটা নিউট্রন, একটা পজিট্রন আর একটা ইলেকট্রন নিউট্রিনো তৈরি হয়।  ওই নিউট্রিনো কনাটা শুধু মাত্র অল্প কিছু পদার্থের সাথে ক্রিয়া বিক্রিয়া করে ফলে ফিউশনে প্রতি সেকেন্ডে তৈরি হওয়া কোটি কোটি নিউট্রিনো কনার অধিকাংশই সূর্য থেকে বেড়িয়ে এসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। যারা পৃথিবীতে এসে পৌছায় তারা আবার পৃথিবীর শরীর ফুড়ে পেরিয়ে যায়। এভাবে প্রতি সেকেন্ডে সূর্য থেকে আসা ১০০ ট্রিলিয়ন বা ১০০ কোটি লক্ষ নিউট্রিনো আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে চলে যাচ্ছে।  যারা আমাদের শরীরের সাথে কোনো বিক্রিয়াই করে না।  পৃথিবীতে বসেই বিজ্ঞানীরা মাটির নীচে বিশাল ডিটেক্টর বানিয়ে এই নিউট্রিনো কে ডিটেক্ট করতে পেরেছেন। এবং সরাসরি প্রমান করে দেখিয়েছেন যে সুর্যের ভিতর আসলেই এই নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটছে। এটা প্রমান করতে আমাদের সুর্যের ভেতরে যেতে হয়নি।

Nirjon Niyaz (Tariq)

The administrator of WHQ Bangla

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *