মানুষের মনে নানান সময়ে নানান খেয়াল আসে।চিন্তার গভীরে ডুবে আমাদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি মারে।অনেক কিছু দেখে আমাদের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।যেমন ধরুন,কখনো জুস বা ঠান্ডা পানীয় পান করার সময় হঠাৎ গ্লাসের বরফের দিকে তাকিয়ে আমরা ভাবতে পারি যে এই বরফটি পানির থেকে হালকা হওয়া সত্ত্বেও কেন ডুবে না যেয়ে ভেসে আছে?অথবা ধরুন,টাইটানিক সিনেমায় যখন জাহাজটি বরফের চাইয়ের সাথে ধাক্কা খায় তখনও অনেকে আফসোস করে মনে করতে পারেন বরফটি কেন পানিতে না ডুবে ভেসে থাকলো।ডুবে গেলেই তো এত বড় দুর্ঘটনা ঘটতো না। সবার মনেই কমবেশি একবার হলেও এই প্রশ্নটি অবশ্যই এসেছে যে বরফ পানির থেকে ভারী হলেও কেন ডুবে যায়না।

এর উত্তর জানতে গেলে একদম ছোটবেলার কিছু পড়া আমাদের আবার মনে করতে হয়।যদিও বিজ্ঞান এতও সহজ না কিন্ত তারপরও চলুন এই উত্তর জানার চেষ্টা করি।

বরফ,পানি বা বাষ্প, তিনটিই মূলত পানির তিনটি আলাদা অবস্থা। পানি যখন পানি তখন এটি তরল, বরফ হলে কঠিন আর বাষ্প হলে বায়বীয় অবস্থা।পানির তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিক তাপমাত্রার থেকে কমানো হয় বা ঠান্ডা করা হয় তখনই পানি জমে বরফের সৃষ্টি হয়।আর এখানেই মূলত প্রশ্নটি জাগে যে যেহেতু জমিয়ে কঠিন অবস্থা হয় তাহলে কেন এটি অন্য বস্তর থেকে আলাদাভাবে এর অবস্থা প্রদর্শন করে?এ জন্য আমাদের এখন জানতে হবে এর পেছনের বিজ্ঞানকে।

এখানে প্রথমে বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের ঘটনাটি আবার মনে করা যাক।উনি গবেষণা করে বের করেন যে একটি বস্তু পানিতে ডোবালে সেটি তার ভরের সমান জায়গা দখল করে।মানে গ্লাস ভর্তি পানিতে একটি বরফ ডোবালে গ্লাস থেকে যে পানিটুকু উছলে পরে যাবে সেটুকুই বরফের ভর।কিন্ত এর সাথে ভেসে থাকার সম্পর্ক কি?আসলে এই ডুবে থাকা বা ভেসে থাকার জন্য যেটি মূলত দায়ী তা হল কোনো বস্তর ঘনত্ব।কোনো বস্তর ভর বা মূলত ঘনত্ব বেশি হলে তা পানিতে ডুবে যাবে।বিপরীত হলে ভেসে থাকবে।এখানে সহজ ভাষায় বরফের ঘনত্ব পানির থেকে কম বিধায় এটি পানিতে ভেসে থাকে।কিন্ত কিভাবেই বা কঠিন বস্তুর ঘনত্ব তরলের থেকে কম হয় তা জানতে হলে আমাদের আরেকটি গভীরে প্রবেশ করতে হবে।

পানি মূলত 2 অণু হাইড্রোজেন ও এক অণু অক্সিজেনের মধ্যে ইলেকট্রন আদানপ্রদানের দ্বারা সৃষ্ট তরল।এই হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন অণুগুলোর মধ্যে হাইড্রোজেন বন্ধন বা কোভ্যালেন্ট বন্ধন তৈরির মাধ্যমে পানির সৃষ্টি হয়।2টি ইলেকট্রন শেয়ারের মাধ্যমে এই বন্ধন তৈরি।পানির বিন্দুতে এই হাইড্রোজেন বন্ধন ক্রমাগতভাবে ভাঙছে এবং নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে।4 ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপর এই ভাঙা গড়ার মাত্রা অত্যন্ত বেশি বিধায় এর ভেতর একটি অস্থির অবস্থা বিরাজমান।এ জন্য এর অবস্থাও স্থায়ী বা সুসজ্জিত না।অন্যদিকে,4 ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে যখন বরফ গঠিত হয় তখন এর অভ্যন্তরীণ শক্তি বা কাইনেটিক এনার্জি পানির থেকে শ্লথ হয়ে যায়।যেকারণে এখানে ভাঙা ও গঠনের মাত্রা কম।মূলত,ভাঙার থেকেও জোড়া লাগার হার এদিকে বেশি,এজন্য এটি স্থির ও এর অণুগুলো সুসজ্জিত।আর আমরা জানি ই যে কোনো অস্থির বস্তুর চেয়ে সুস্থির বস্তুর স্ট্যাবিলিটি বেশি হয় এবং সুস্থির হওয়ার জন্য এর ঘনত্বও কমে যায়।আর এটিই বরফ পানির থেকে ভারী বস্তু হলেও ভেসে থাকার জন্য প্রধান কারণ।

সহজ করে বললে,বরফের ঘনত্বই এর ভেসে থাকার একমাত্র কারণ।এ জন্যই আমরা বারবার চেষ্টা করলেও কখনো বরফকে পানিতে ডুবাতে পারবোনা।বরফ তার নিজ গঠনের কারণেই আবার ভেসে উঠবে।

Photo Source – Unsplash

লিখেছেনঃ

নাজিয়া ফারজানা

Leave a Reply

Your email address will not be published.